এক্সচেঞ্জ- ট্রেডেড ফান্ড কি এর প্রকারভেদ এবং এটি কিভাবে কাজ করে
এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফ একটি বিনিয়োগ তহবিল, যা বিভিন্ন ধরনের সম্পদ বা সিকিউরিটিজ ধারণ করে। ইটিএফকে একধরনের "ঝুড়ি বিনিয়োগ" বলা যেতে পারে কারণ এটি একাধিক স্টক, বন্ড বা পণ্যের একটি সংগ্রহকে প্রতিনিধিত্ব করে। এটি স্টকের মতোই একটি এক্সচেঞ্জে কেনা-বেচা করা যায়, তবে মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বৈচিত্র্যময়।

ক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফ একটি বিনিয়োগ তহবিল, যা বিভিন্ন ধরনের সম্পদ বা সিকিউরিটিজ ধারণ করে। ইটিএফকে একধরনের "ঝুড়ি বিনিয়োগ" বলা যেতে পারে কারণ এটি একাধিক স্টক, বন্ড বা পণ্যের একটি সংগ্রহকে প্রতিনিধিত্ব করে। এটি স্টকের মতোই একটি এক্সচেঞ্জে কেনা-বেচা করা যায়, তবে মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বৈচিত্র্যময়।
ইটিএফ-এর বিশেষত্ব হলো, এটি একটি নির্দিষ্ট সূচক (যেমন S&P 500) বা শিল্প (যেমন প্রযুক্তি বা জ্বালানি) ট্র্যাক করার জন্য তৈরি হয়। বিনিয়োগকারীরা পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আনতে, আয় বাড়াতে বা ঝুঁকি কমাতে ইটিএফ ব্যবহার করেন।
এক্সচেঞ্জ- ট্রেডেড ফান্ড কি?
এক্সচেঞ্জ-ট্রেড-ফান্ড (ETFs) হলো এমন একটি বিনিয়োগ মাধ্যম যা স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার হিসেবে লেনদেন করা যায়। এটি মিউচুয়াল ফান্ডের মতো কাজ করে, তবে সরাসরি শেয়ার মার্কেটে কেনা-বেচা করা হয়। একটি ETF সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো সূচক (যেমন S&P 500) ট্র্যাক করে, যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা একটি সম্পূর্ণ বাজার বা সেক্টরে বিনিয়োগ করতে পারেন। এটি বৈচিত্র্যপূর্ণ পোর্টফোলিও, কম খরচ এবং সহজ লেনদেনের সুযোগ প্রদান করে।
তবে ETFs বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি রয়েছে, যেমন বাজার ওঠানামার প্রভাব এবং লেনদেন খরচ। এটি স্টক মার্কেটের মতোই কাজ করে, তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি ভালো বিকল্প হতে পারে, কারণ এটি সহজে কেনা-বেচা করা যায় এবং কম খরচে বৈচিত্র্যপূর্ণ বিনিয়োগ নিশ্চিত করে।
এক্সচেঞ্জ- ট্রেডেড ফান্ড এর ধরণ
বাজারে বিভিন্ন ধরণের ETFs রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন চাহিদা এবং কৌশল অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি ETF ভিন্ন ভিন্ন বাজার, সম্পদ, অথবা বিনিয়োগ লক্ষ্যকে প্রতিফলিত করে।
১. প্যাসিভ ETFs
প্যাসিভ ETF-এর উদ্দেশ্য হলো একটি নির্দিষ্ট সূচক বা বাজারকে অনুসরণ করা। উদাহরণস্বরূপ, S&P 500 ETF S&P 500 সূচকের কর্মক্ষমতা প্রতিলিপি করে। এগুলো কম খরচে বৈচিত্র্যপূর্ণ বিনিয়োগের জন্য ব্যবহার করা হয়।
২. সক্রিয়ভাবে পরিচালিত ETFs
এগুলো পোর্টফোলিও পরিচালকদের দ্বারা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হয়। কোন সিকিউরিটি কেনা বা বিক্রি করতে হবে, তা পরিচালকেরা সিদ্ধান্ত নেন। সক্রিয় ETF প্যাসিভ ETF-এর চেয়ে বেশি লাভ দিতে পারে, তবে এগুলোর ব্যবস্থাপনা খরচ তুলনামূলক বেশি।
৩. বন্ড ETFs
বন্ড ETF মূলত বিভিন্ন বন্ডের সমন্বয়ে গঠিত, যা নিয়মিত আয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি সরকারি, কর্পোরেট, অথবা পৌর বন্ডের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। বন্ড ETF-এর নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই, তাই এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য জনপ্রিয়।
৪. শিল্প বা সেক্টর ETFs
একটি নির্দিষ্ট শিল্প বা সেক্টরের স্টকগুলোর উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, iShares U.S. Technology ETF (IYW) প্রযুক্তি খাতের স্টকগুলোর কর্মক্ষমতা ট্র্যাক করে।
৫. কমোডিটি ETFs
কমোডিটি ETF বিভিন্ন পণ্য, যেমন তেল, সোনা, বা প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। এই ধরনের ETF সরাসরি পণ্য কেনার ঝামেলা দূর করে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী বিকল্প সরবরাহ করে।
৬. কারেন্সি ETFs
কারেন্সি ETF বিভিন্ন দেশের মুদ্রা বা মুদ্রার জোড়ার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। এটি আমদানিকারক এবং রপ্তানিকারকদের জন্য ঝুঁকি হ্রাস করার একটি উপায়।
৭. বিটকয়েন ETFs
বিটকয়েন ETF ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারের সরাসরি এক্সপোজার প্রদান করে। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি কমিয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড ফান্ডের মতো কাজ করে।
৮. ইথেরিয়াম ETFs
ইথেরিয়াম ব্লকচেইনের মুদ্রা ইথার ট্র্যাক করে। এটি ২০২৪ সালে SEC কর্তৃক অনুমোদিত হয় এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে অংশগ্রহণের একটি সহজ উপায় প্রদান করে।
৯. বিপরীত ETFs
বাজারের পতন থেকে মুনাফা অর্জনের জন্য বিপরীত ETF ব্যবহৃত হয়। এটি ডেরিভেটিভ ব্যবহার করে, যা বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও হেজ করতে সহায়তা করে।
১০. লিভারেজড ETFs
লিভারেজড ETF মূলত অন্তর্নিহিত সূচকের কর্মক্ষমতার দ্বিগুণ বা ত্রিগুণ লাভ দেয়। এটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও উচ্চ রিটার্ন প্রদান করতে সক্ষম।
ইটিএফ কীভাবে কাজ করে?
নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ETF চালু করতে হলে, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (SEC) নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। বেশিরভাগ ETF ওপেন-এন্ডেড তহবিলের মতো কাজ করে, যেখানে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা সীমাবদ্ধ নয়।
প্রতিষ্ঠা এবং শেয়ার ইস্যু: ETF তৈরি করার সময় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করা হয়। এই তহবিল ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সিকিউরিটিজ কেনা হয়, যা সূচকের কর্মক্ষমতা প্রতিলিপি করে।
শেয়ার তৈরি এবং খালাস প্রক্রিয়া: অনুমোদিত অংশগ্রহণকারী (AP) নামে পরিচিত বিশেষ বিনিয়োগকারীরা ETF-এর নতুন শেয়ার তৈরি এবং বাজার থেকে শেয়ার সরানোর কাজ করে। যখন নতুন শেয়ার তৈরি হয়, AP সূচকের স্টক কেনে এবং তা ETF-এর কাছে জমা দেয়। এর বিনিময়ে, তারা ETF শেয়ার পায়।শেয়ার সরানোর ক্ষেত্রে AP তাদের মালিকানাধীন ETF শেয়ার ফেরত দিয়ে নির্দিষ্ট স্টক বা সিকিউরিটি পায়।
লেনদেনের সহজলভ্যতা: ETF শেয়ারগুলো শেয়ারবাজারে কেনা-বেচা করা হয়। শেয়ারের দাম সরাসরি বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের উপর নির্ভর করে। ETF-এর নেট অ্যাসেট ভ্যালু (NAV) বা সম্পদের মোট মূল্যও শেয়ারের দামে প্রভাব ফেলে।
ETFs-এর সুবিধা
১. বৈচিত্র্যপূর্ণ পোর্টফোলিও: একটি ETF-এ বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার থাকে। তাই এটি বৈচিত্র্যপূর্ণ বিনিয়োগ নিশ্চিত করে।
২. কম খরচ: মিউচুয়াল ফান্ডের তুলনায় ETFs-এ ম্যানেজমেন্ট ফি কম হয়।
৩. সহজ লেনদেন: এটি শেয়ার মার্কেটে শেয়ারের মতোই কিনতে বা বিক্রি করতে পারেন।
৪. পার্থক্যহীন পারফরম্যান্স: অধিকাংশ ETFs একটি নির্দিষ্ট সূচক (Index) ট্র্যাক করে, যেমন S&P 500। তাই পারফরম্যান্স সূচকের মতোই হয়।
৫. লিকুইডিটি: ETFs সহজে শেয়ার মার্কেটে বিক্রি করা যায়, তাই এটি দ্রুত নগদে রূপান্তর করা সম্ভব।
ETFs-এর অসুবিধা
১. লেনদেন খরচ: প্রতিবার কেনা-বেচার সময় ট্রেডিং কমিশন দিতে হয়।
২. কম রিটার্ন: দীর্ঘমেয়াদে মিউচুয়াল ফান্ডের তুলনায় রিটার্ন কম হতে পারে।
৩. বাজার ঝুঁকি: ETFs স্টক মার্কেটের মতোই বাজার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়।
৪. কম ফোকাস: এটি নির্দিষ্ট সেক্টর বা কোম্পানির উপর ফোকাস করে না, তাই যদি কোনো বিশেষ সেক্টরে বিনিয়োগ করতে চান, তাহলে এটি আপনার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে।
ETFs-এ কীভাবে বিনিয়োগ করবেন?
- বাজার সম্পর্কে ধারণা নিন: শেয়ার মার্কেট ও বিভিন্ন ETFs সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করুন।
- ব্রোকারেজ অ্যাকাউন্ট খুলুন: যেকোনো বিশ্বস্ত ব্রোকারেজ ফার্মে অ্যাকাউন্ট খুলুন।
- আপনার লক্ষ নির্ধারণ করুন: আপনার বিনিয়োগের উদ্দেশ্য এবং ঝুঁকি গ্রহণ ক্ষমতা নির্ধারণ করুন।
- পছন্দের ETFs বেছে নিন: আপনার লক্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ETFs নির্বাচন করুন। উদাহরণস্বরূপ, স্টক মার্কেট সূচক ট্র্যাক করা, সোনা, তেল, বা আন্তর্জাতিক বাজার ভিত্তিক ETFs।
- ট্রেডিং শুরু করুন: ব্রোকারেজ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আপনার পছন্দের ETFs কিনুন।
- বিনিয়োগ পর্যবেক্ষণ করুন: নিয়মিত আপনার বিনিয়োগের পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনুন।
কিছু জনপ্রিয় ETFs এর উদাহরণ
১. SPDR S&P 500 ETF (SPY): এটি S&P 500 সূচক ট্র্যাক করে।
২. iShares MSCI Emerging Markets ETF (EEM): উদীয়মান বাজারের শেয়ারগুলো ট্র্যাক করে।
৩. Vanguard Total Stock Market ETF (VTI): পুরো মার্কিন স্টক মার্কেট কভার করে।
ইটিএফ, মিউচুয়াল ফান্ড এবং স্টক এর মধ্যে তুলনা
ইটিএফ, মিউচুয়াল ফান্ড এবং স্টক-এর মধ্যে যে সব পার্থক্য সমূহ রয়েছে:
ইটিএফ |
মিউচুয়াল ফান্ড |
স্টক |
একাধিক সম্পদের প্রতিনিধিত্ব করে |
একত্রিত সম্পদে বিনিয়োগ করে |
একক কোম্পানির মালিকানা |
স্টকের মতো বাজারে লেনদেন করা যায় |
দিনে একবার লেনদেন হয় |
সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন |
ফি সাধারণত কম |
বেশি ফি থাকতে পারে |
চলমান ফি নেই |
লভ্যাংশ ও কর
ইটিএফ বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশের মাধ্যমে আয় করতে পারেন। যারা লভ্যাংশ প্রদানকারী ইটিএফ কিনেন, তারা তহবিল থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ পেয়ে থাকেন।
ইটিএফ মিউচুয়াল ফান্ডের তুলনায় কর-সাশ্রয়ী কারণ এর শেয়ার সরাসরি বাজারে কেনা-বেচা করা যায়। ফলে শেয়ার বিক্রয়ের সময় করের দায় কম হয়।
উপসংহার
এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড (ETF) হলো সীমিত বাজেটে বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগের একটি সাশ্রয়ী উপায়। এটি বিনিয়োগকারীদের একটি বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও তৈরি করার সুযোগ দেয় এবং ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক। তবে, বিনিয়োগ করার আগে বাজারের অবস্থার উপর নজর রাখা এবং প্রয়োজনীয় গবেষণা করা গুরুত্বপূর্ণ। ইটিএফ বিনিয়োগকারীদের, বিশেষত যারা দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা করছেন তাদের জন্য একটি চমৎকার পছন্দ হতে পারে ।
What's Your Reaction?






