FOMO কী? এবং ক্রিপ্টো ট্রেডিং এ এর প্রভাব

অনেক বিনিয়োগকারী লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ হারানোর ভয় পান। এই ভয়কে একটি বিশেষ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয় যাকে FOMO (ফিয়ার অফ মিসিং আউট) বলা হয় । FOMO হলো এমন একটি শব্দ যা ক্রিপ্টোকারেন্সি দুনিয়ায় খুব পরিচিত। এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে লোকজন অযৌক্তিক এবং যাচাই-বাছাই না করে বিনিয়োগ বা ট্রেডিং সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।

Mar 3, 2025 - 10:29
Mar 3, 2025 - 10:57
 0  14
FOMO কী? এবং ক্রিপ্টো ট্রেডিং এ এর প্রভাব

অনেক বিনিয়োগকারী লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ হারানোর ভয় পান। এই ভয়কে একটি বিশেষ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয় যাকে FOMO (ফিয়ার অফ মিসিং আউট) বলা হয় । FOMO হলো এমন একটি শব্দ যা ক্রিপ্টোকারেন্সি দুনিয়ায় খুব পরিচিত। এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে লোকজন অযৌক্তিক এবং যাচাই-বাছাই না করে বিনিয়োগ বা ট্রেডিং সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। 

গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে FOMO বেশি দেখা যায়। তবে এটি শুধু এই বয়সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্রিপ্টো FOMO কী এবং এটি মোকাবিলা করার উপায়গুলে নীচে আলোচনা করা হল। 

ক্রিপ্টোতে FOMO কী? 

ক্রিপ্টোতে FOMO ঘটে যখন কেউ যদি সঠিকভাবে যাচাই না করে শোনা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ বা ট্রেডিং করে ফেলে। এই কারণে মানুষ অনেক সময় উচ্চমূল্যে সম্পদ কিনে ফেলে, যেখানে একটু কৌশলী হলে অনেক লাভজনক মূল্যে তা কেনা যেত। 

কখনও কখনও, ক্রিপ্টো FOMO-এর কারণে শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয় না, বরং এটি মানসিক স্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে পরিবার থেকে দূরে সরে যাওয়া, উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতার মতো সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। 

FOMO-এর সাথে সম্পর্কিত স্বাস্থ্য ঝুঁকি 

যদি কেউ খারাপ বিনিয়োগের পাল্লায় পড়ে বড় অঙ্কের অর্থ হারায়,এর ফলে মানসিকভাবে খুবই ক্ষতিকর হতে পারে। এর ফলে ব্যক্তি তার সম্পর্ক, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলতে পারে। পর্যাপ্ত যত্ন না নিলে এটি সামাজিক এবং মানসিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। 

৮০ বছরের হার্ভার্ড গবেষণায় রবার্ট ওয়াল্ডিঙ্গার উল্লেখ করেছেন যে, আমাদের সম্পর্ক এবং সেগুলোতে আমাদের সুখ মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব ক্রিপ্টো বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 

ক্রিপ্টোতে FOMO-এর উদাহরণ 

২০২৩ সালে একটি গুজব ছড়িয়েছিল যে স্পট বিটকয়েন ETF অনুমোদিত হয়েছে। এই গুজবের কারণে বিটকয়েনের মূল্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই $২,০০০ বেড়ে যায়, যদিও পরে এটি আবার কমে যায়। 

ক্রিপ্টো দুনিয়ায় FOMO অনেককে যাচাই না করেই শিটকয়েনে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করে। তবে যেকোনো ক্রিপ্টোকারেন্সি টোকেনে বিনিয়োগ করার আগে সঠিক গবেষণা করা এবং যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

FOMO-এর কারণ এবং সমাধান 

FOMO (ফিয়ার অফ মিসিং আউট) ক্রিপ্টোকারেন্সি জগতে বিভিন্ন কারণে তৈরি হয়। এই কারণগুলো বোঝা এবং চিহ্নিত করা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ভবিষ্যতে এমন আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করতে পারে। নিচে কিছু প্রধান কারণ দেওয়া হলো, যা একজন ক্রিপ্টো ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারী হিসেবে FOMO কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হতে পারে। 

১. পরবর্তী বড় সুযোগ ধরার চেষ্টা 

বিটকয়েন বা ইথেরিয়ামের মতো প্রাথমিক বিনিয়োগকারীরা কী পরিমাণ লাভ করেছেন, তা জানার পরে অনেকেই পরবর্তী বড় সুযোগ ধরার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। উদাহরণস্বরূপ, বিটকয়েনের মূল্য ৬৮,০০০% পর্যন্ত বেড়েছে (২৮ জুলাই, ২০২৪ পর্যন্ত)। এ ধরনের লাভের গল্পগুলো অনেক সময় FOMO তৈরি করে। 

২. বড় ক্ষতি এড়ানোর ভয় 

FOMO শুধু লাভের জন্য নয়, অনেক সময় ক্ষতি এড়ানোর জন্যও হয়। যেমন ২০২২ সালে TerraUSD (UST) এবং Luna স্টেবলকয়েন বিপর্যয়ের কারণে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়। এই ধরনের ক্ষতি এড়ানোর চেষ্টা মানুষকে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। 

৩. অতিরিক্ত তথ্যের প্রভাব 

তথ্য ক্রিপ্টো জগতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে, যখন বিভিন্ন উৎস থেকে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়, তখন তা FOMO বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষত, যদি সেসব তথ্য যাচাই না করা হয়। 

৪. "প্রথম হওয়া মানেই সফলতা" ধারণা 

অনেকে মনে করেন, যারা বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সিতে শুরুতে বিনিয়োগ করেছেন, তারাই সবচেয়ে বেশি সফল। এই ধারণা মানুষকে তাড়াহুড়ো করে নতুন এবং অপরীক্ষিত ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ করতে প্ররোচিত করে। 

৫. নতুন এবং অনিয়ন্ত্রিত বাজার 

ক্রিপ্টো মার্কেট তুলনামূলকভাবে নতুন এবং অনেকটাই অনিয়ন্ত্রিত। এখানে প্রবেশের বাধা কম থাকায় কম জ্ঞানসম্পন্ন বিনিয়োগকারীরাও আসতে পারেন। এই অবস্থার কারণে অনেকেই FOMO-তে আক্রান্ত হন। 

FOMO-এর লক্ষণ কীভাবে বুঝবেন? 

FOMO চিহ্নিত করার পাশাপাশি এর লক্ষণগুলো নিজের মধ্যে খুঁজে পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। নিচে FOMO-এর কিছু সাধারণ লক্ষণ উল্লেখ করা হলো:

  • একটি ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে তা না কিনলেই মিস হয়ে যাবে মনে করা।
  • সম্প্রতি জনপ্রিয় হওয়া কোনো ক্রিপ্টো সম্পদে বিনিয়োগের ইচ্ছা। 
  • ক্রমাগত এই চিন্তা করা, একটি ট্রেড করলে কত লাভ হতে পারত।
  •  ক্রিপ্টো ট্রেন্ড এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রিপ্টো নিয়ে চরম আসক্তি। 

এই ধরনের আচরণ থেকে বোঝা যায় যে লোভ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারণত অযৌক্তিক এবং স্বল্পস্থায়ী হয়। 

একজন ব্যবসায়ী হিসেবে FOMO কীভাবে এড়াবেন 

১. গবেষণার জন্য সময় দিন 

FOMO প্রায়ই বিভিন্ন অজানা উৎস থেকে আসা তথ্যের কারণে হয়, যা অনেক সময় যাচাই করা হয় না। একজন ক্রিপ্টো বিনিয়োগকারী হিসেবে, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেই মুদ্রার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিজের গবেষণা করা অত্যন্ত জরুরি। এটি অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত থেকে আপনাকে রক্ষা করবে, যা ক্ষতির কারণ হতে পারে। 

২. নির্ভরযোগ্য সূত্রের ওপর ভরসা করুন 

FOMO এড়ানোর আরেকটি ভালো উপায় হল বিশ্বস্ত মিডিয়া আউটলেট এবং বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা। এ ধরনের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য ক্রিপ্টো সম্পদ কেনা বা বিক্রির সময় আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। বিশ্লেষণ করা তথ্য আপনাকে বিনিয়োগের সঠিক পথ নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে। 

৩. সবসময় লাভ হবে না, তা মেনে নিন 

জীবনে যেমন ওঠা-নামা থাকে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তাই। সব সময় মুনাফা হবে না, মাঝে মাঝে ক্ষতিও হতে পারে। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া একজন বিনিয়োগকারীকে আরও যৌক্তিক এবং ধৈর্যশীল করে তোলে। ক্ষতি এড়িয়ে কৌশল নির্ধারণ করাই FOMO এড়ানোর অন্যতম উপায়। 

৪. একটি কৌশল তৈরি করুন 

FOMO থেকে নিজেকে রক্ষা করতে একটি নির্দেশিকা কৌশল তৈরি করুন। এটি হতে পারে আপনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি নিয়ম, যেমন কোনো বিনিয়োগের আগে তার টোকেনমিক্স বা ব্যবহার পদ্ধতি যাচাই করা। মৌলিক এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ একত্রিত করে ভালোভাবে চিন্তাভাবনা করুন, যাতে ভুল সিদ্ধান্ত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন। 

৫. বাজারের চক্র সম্পর্কে জানুন 

ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারও অন্যান্য আর্থিক বাজারের মতো চক্রাকারে চলে। এটি কখনো বুল মার্কেটের (দামের ঊর্ধ্বগতি) বা কখনো বিয়ার মার্কেটের (দামের নিম্নগতি) মধ্যে থাকে। বাজারের এই চক্র সম্পর্কে জানা আপনাকে সঠিক সময়ে ট্রেড করা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেবে, যা FOMO এড়াতে সাহায্য করবে। 

৬. পূর্বের ভুল থেকে শিক্ষা নিন 

FOMO থেকে বাঁচার অন্যতম সেরা উপায় হলো পূর্বে করা ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া। মনে করুন, আপনি একবার গুজবে বিশ্বাস করে বিটকয়েন বিক্রি করেছিলেন, কিন্তু পরে এর দাম বেড়ে গিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিখুন এবং ভবিষ্যতে এমন ভুল এড়ানোর চেষ্টা করুন। পুরনো ভুলের শিক্ষা আপনাকে ভবিষ্যতের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করবে। 

মনে রাখবেন, FOMO প্রতারকদের হাতিয়ার হতে পারে 

ক্রিপ্টোকারেন্সি জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকে অনেক প্রাথমিক মুদ্রা অফার (ICO) বাজারে এসেছে। এর মধ্যে কিছু প্রকৃত, তবে বেশিরভাগই প্রতারণার ফাঁদ। প্রতারকরা FOMO-এর মাধ্যমে মানুষকে তাড়াহুড়ো করে বিনিয়োগে প্ররোচিত করে, যাতে তারা সহজেই তাদের অর্থ হাতিয়ে নিতে পারে। 

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০% ICO আসলে প্রতারণামূলক। অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছোট ছোট ক্রিপ্টো প্রতারণায় প্রতিদিন প্রায় ৯ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। যখন FOMO আপনার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে, তখন অনেক ভুয়া প্রকল্পকেও সত্যি মনে হতে পারে। তাই, এ বিষয়ে সচেতন থাকা খুবই জরুরি। 

প্রতারণা এড়ানোর উপায় 

FOMO থেকে বাঁচতে এবং প্রতারণার শিকার না হতে কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে হবে: 

১. গভীরভাবে যাচাই করুন: কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে এর সত্যতা এবং কার্যকারিতা ভালোভাবে বিশ্লেষণ করুন। 

২. বিশ্বস্ত সূত্র অনুসরণ করুন: কেবলমাত্র নির্ভরযোগ্য মিডিয়া এবং বিশেষজ্ঞদের তথ্যের ওপর নির্ভর করুন। 

৩. অতিউৎসাহী হবেন না: হঠাৎ করে লাভের আশা নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। 

ইতিহাস থেকে শিক্ষা 

FOMO শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে নয়, এটি মানুষের সহজাত প্রবণতা। ঊনবিংশ শতাব্দীর সোনার ভিড়ের সময় মানুষ বিপুল অর্থ খরচ করে সোনার খোঁজে বেরিয়েছিল। বেশিরভাগ মানুষ এই ঝুঁকিতে পড়ে তাদের সম্পদ হারিয়েছে। 

ঠিক তেমনই, ক্রিপ্টোতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সতর্ক না হলে FOMO ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একসময় জনপ্রিয় ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ FTX-কে লাভজনক ও বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করা হতো। কিন্তু এর জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পর এটি ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে অনেক মানুষ তাদের সঞ্চয় এবং এমনকি বাসাও হারিয়েছেন। 

 মূল কথা 

FOMO আমাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলার শক্তিশালী একটি আবেগ। তবে এটি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হতে হয়। নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন যথাযথ তথ্য, গবেষণা, এবং বিনিয়োগের কৌশল। ক্রিপ্টোকারেন্সি বা যে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে সফল হতে হলে ধৈর্য, সচেতনতা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অপরিহার্য। তাই, আবেগের বদলে যুক্তি দিয়ে কাজ করুন এবং আপনার সম্পদকে সুরক্ষিত রাখুন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

J. B. Chkma Blockchain content writer